ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়েই হচ্ছে একমাত্র বৈধ উপায়। মানুষ বিয়ে করার মাধ্যমেই তার চরিত্র ও সতীত্বকে রক্ষা করতে পারে। পোষাক যেমন মানুষের দেহকে ঢেকে রাখে, নগ্নতা ও কুশ্রী বিষয়গুলো প্রকাশ হতে দেয় না, বিবাহ তেমনি স্বামী-স্ত্রীর দোষ-ত্র“টি ও যৌন উত্তেজনা ঢেকে রাখে, প্রকাশ হতে দেয় না। আল্লাহ তা‘আলা বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রেম-প্রীতি, মায়া-মমতা, দরদ-সহানুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্ভোগ খুবই তৃপ্তিপূর্ণ হয়, মুখের গন্ধ খুবই মিষ্টি হয়, দাম্পত্য জীবন যাপন খুবই সুখের হয়, পারস্পরিক কথাবার্তা খুবই আরামদায়ক হয়। বিয়ের মাধ্যমে পরস্পরের উপর অধিকার আরোপিত হয় এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন
ঃ وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجاً وَذُرِّيَّةً (الرعد: من الآية৩৮)
“আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদের জন্য স্ত্রী ও সন্তানের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।” (সূরা রা’দ ৩৮) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বিয়ে ও স্ত্রী গ্রহণের ব্যবস্থাকে নবী ও রাসূলগণের প্রতি এক বিশেষ দান বলে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন
, وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ (النور: من الآية৩২) “
আর তোমরা তোমাদের এমন ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দাও যাদের স্বামী বা স্ত্রী নেই, আর তোমাদের বিয়ের যোগ্য দাস-দাসীদের বিয়ে দাও।” (সূরা নূর ৩২)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন
ঃ فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ (النساء: من الآية২৫) “
তোমরা মেয়েদের অভিভাবকের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে কর, যথাযথভাবে তাদের মোহর প্রদান কর, যেন তারা বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে এবং অবাধ যৌন চর্চায় আর গোপন বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে না পড়ে।” (সূরা নিসা ২৫)
অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বিয়ে করে পরিবার দূর্গ রচনা করতে বলেছেন। যিনা-ব্যাভিচার বন্ধ করার আদেশ করেছেন। গোপন বন্ধুত্ব করে যৌন স্বাদ আস্বাদন করার সমস্ত পথ বন্ধ করার আদেশ করেছেন। এগুলো কেবল বিয়ের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন ঃ
هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُن (البقرة: من الآية১৮৭)
“স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ, আর তোমরা হচ্ছো তাদের জন্য পোশাক স্বরূপ।” (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৭) অত্র আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পোশাক যেমন মানবদেহকে আবৃত করে দেয়, তার নগ্নতা ও কুশ্রীতা প্রকাশ হতে দেয় না এবং সব রকমের ক্ষতি থেকে বাঁচায়, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ঠিক তেমনি।
আল্লাহ অন্যত্র বলেন ঃ
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجاً لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً (الروم: من الآية২১) “
এবং আল্লাহ্র একটি বড় নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের স্ত্রীর ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা যেন তাদের কাছ থেকে পরম পরিতৃপ্তি লাভ করতে পার। আর তোমাদের মধ্যে তিনি প্রেম, ভালবাসা ও প্রীতি প্রণয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন।” (সূরা রূম ২১)
অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নারীকে পুরুষ হতে সৃষ্টি করে বিয়ের ব্যবস্থা করা আল্লাহ্র নিদর্শন। নারী পুরুষের জন্য তৃপ্তিদায়ক বস্তু। তৃপ্তি বহাল রাখার জন্য স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্রেম-ভালবাসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
عَنْ أَنَسِ بْنَ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ رَسُولُ اللهِ (সাঃ)........ لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
আনাস (রাযি.) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন ঃ কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ছিয়াম পালন করি, ছিয়াম ভঙ্গও করি, রাতে ছালাত আদায় করি, নিদ্রাও যাই এবং বিয়েও করি। এই হচ্ছে আমার নীতি আদর্শ। অতএব যে ব্যক্তি আমার এ নীতি মানবে না, সে আমার উম্মাতের মধ্যে গণ্য নয়। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত- হা/১৪৫ ঈমান অধ্যায়, কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা অনুচ্ছেদ)
অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে করা নবীর সুন্নাত। ইসলামের অন্যতম রীতি ও বিধান। ইসলামে বৈরাগ্যবাদের কোন অবকাশ নেই। যে ব্যক্তি সুন্নাতের প্রতি অনীহা পোষণ করে বিয়ে করবে না, সে পূর্ণ মুসলিম নয় বরং তা কুফরী।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بن مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ (সাঃ) يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنْ اسْتَطَاعَ منكم الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ
لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন ঃ হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণকারী, যৌন অঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন ছিয়াম পালন করে। কেননা ছিয়াম হচ্ছে যৌবনকে দমন করার মাধ্যম। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত- নিকাহ অধ্যায়, হা/৩০৮০)
অত্র হাদীছে বিয়ের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। রাসূল (সাঃ) সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে বিয়ের আদেশ করেছেন। বিয়ে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিয়ে যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষা করে।
عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ قَالَ رَدَّ رَسُولُ اللهِ (সাঃ) عَلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُونٍ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لاَخْتَصَيْنَا
সা‘আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ (রাযি.) বলেন ঃ রাসূল (সাঃ) উছমান ইবনে মাযউনকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে যেতাম। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত- হাঃ/৩০৮১, নিকাহ অধ্যায়)
অত্র হাদীছে বৈরাগ্য প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিঃসন্তান হওয়ার প্রচেষ্টাকে চিরতরে বন্ধ করা হয়েছে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ (সাঃ) قَالَ ثَلاَثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ عَوْنُهُمْ الْمُكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الْأَدَاءَ وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ وَالْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللهِ. (النسائي ৩১৬৬)
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন ঃ তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি আল্লাহ্র সাহায্য করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। (১) যে দাস নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়। (২) যে লোক বিয়ে করে নিজের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করতে চায়। (৩) যে ব্যক্তি আল্লাহ্র পথে জিহাদে যেতে চায়। (নাসাঈ) অত্র হাদীছে রাসূল (সাঃ) তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি সাহায্য করতে বলেছেন, তন্মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করার উদ্দেশে বিয়েকারী। অত্র হাদীছে রাসূল (সাঃ) বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।

0 comments:
Post a Comment