৭০. তারা বলল, হে লুত! আমরা কি জগদ্বাসীকে অতিথি করতে তোমাকে নিষেধ করিনি!
৭১. সে [লুত (আ.)] বলল, একান্তই যদি তোমরা (বৈধভাবে) কিছু করতে চাও,
তাহলে আমার এই কন্যারা আছে। ৭২. (হে নবী) তোমার জীবনের শপথ! তারা মত্ততায়
বিমূঢ় হয়ে পড়েছে।
(সুরা : হিজর, আয়াত : ৭০-৭২)
তাফসির : কয়েকজন ফেরেশতা মানব আকৃতিতে লুত (আ.)-এর বাড়িতে আসেন।
ফেরেশতাদের আগমনের খবর লুত (আ.)-এর স্ত্রী গ্রামের লোকদের জানিয়ে দেন।
সুন্দর লাবণ্যময় চেহারার কয়েকজন যুবক অবস্থান করছে—এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে
সঙ্গে লোকেরা বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার জন্য তাঁর বাড়িতে ভিড় জমায়। লুত
(আ.) তাদের বলেন, যদি তোমাদের জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে হয়, তাহলে তো তোমাদের
ঘরে স্ত্রীরা আছে। যাদের স্ত্রী নেই তাদের জন্য বহু অবিবাহিত নারী আছে।
তোমরা তাদের বিয়ে করে বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারো। কিন্তু আমি
কিছুতেই এই যুবকদের তোমাদের কাছে সোপর্দ করব না।
লুত (আ.)-এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাঁর জাতি বলেছিল, তুমি তো ভালো
করেই জানো যে নারীদের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা চাই যুবকদের
আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
এ অবস্থায় লুত (আ.) আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হায়! আমার যদি শক্তি থাকত, তাহলে এই পাপাচারী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতাম। ’
লুত (আ.)-এর জাতি এমন জঘন্য পাপ নিঃসংকোচে করতে কিভাবে উদ্ধত হয়েছিল,
তৃতীয় আয়াতে তার একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা
হয়েছে, বিত্ত, বৈষয়িক উন্নতি ও প্রাচুর্যের আধিক্যে মত্ত হয়ে তারা হিতাহিত
জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা কোনো রীতি-নীতি, আইন-আদালত ও উপদেশের
প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি।
কোনো ধর্মেই সমকামিতার বৈধতা দেওয়া হয়নি। এটাও স্পষ্ট যে সমকামিতা
প্রকৃতিবিরোধী একটি কাজ। যৌবন শুধু যৌন চাহিদা পূরণ করার জন্য নয়। মানব
সৃষ্টির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্ত্রী ও পুরুষ মিলে তারা পরিবার গঠন করবে।
এর মাধ্যমে সভ্যতার ভিত্তি সুদৃঢ় হবে। এ উদ্দেশ্যেই পুরুষ ও নারী পৃথক
দুটি লিঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পারস্পরিক যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করা
হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি সমকামিতায় লিপ্ত হয়, সে একই সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধ
করে। প্রথমত, সে তার নিজের ও সর্বজনীন প্রাকৃতিক গঠন ও বিন্যাসের
বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। দ্বিতীয়ত, সে প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
প্রকৃতি তাকে যে উপকরণ ও উপাদান দিয়েছিল, সে তা অন্যায় পথে নষ্ট করে।
তৃতীয়ত, সমাজের প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিকে সে উপেক্ষা করে। চতুর্থত, সমাজ থেকে
সে বিভিন্নভাবে ফায়দা লাভ করে। কিন্তু যখন তার নিজের পালা আসে তখন
স্বার্থপর হয়ে ওঠে। সে নিজেকে বংশ ও পরিবারের খেদমতের অযোগ্য বানায়। দুজন
পুরুষ অস্বাভাবিক স্ত্রীসুলভ কাজে লিপ্ত হয়ে অন্তত দুজন নারীর যৌন অধিকার
হরণ করে। ফলে অন্তত দুজন নারীর জন্য যৌন অনাচার ও নৈতিক অধঃপতনের পথ
উন্মুক্ত হয়ে যায়।
এ আলোচনা থেকে জানা যায়, ঐশী জীবনব্যবস্থায় মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি
দমনে উদ্বুদ্ধ করে না, বরং মানুষকে বৈধ উপায়ে তা নিবারণের পথ প্রদর্শন করা
হয়। যেভাবে হজরত লুত (আ.) বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণের পথ বাতলে দিয়েছেন।
কাজেই মানুষকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে তার সামনে প্রথমে সঠিক পথ তুলে
ধরতে হবে।
গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ

0 comments:
Post a Comment